![]()
বাকৃবি প্রতিনিধি:
মুসলমানদের দুটি বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি ঈদ-উল-আজহা। ঈদের আগমন মানেই সারাদেশে এক আনন্দঘন পরিবেশ। যেখানে ধনী-গরিব, কৃষক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একই আবেগে উদ্দীপ্ত ও উচ্ছ্বাসিত। তবে ঈদ-উল-আজহার তাৎপর্য শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিনটি এক মহান আত্মত্যাগের নিদর্শন হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতি অগাধ আনুগত্য আমাদের জন্য এক অনন্য শিক্ষার মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের প্রজন্ম বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা, এই কুরবানির প্রকৃত অর্থ কতটা হৃদয়ে ধারণ করছে? তারা কি ঈদ-উল-আযহাকে কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছে, নাকি এর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থতা ও সামাজিক সমতার দিকগুলো নিয়েও ভাবছে?এবারে সেই ভাবনাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কয়েকজন শিক্ষার্থীর অনুভূতি ও মতামত তুলে ধরা হলো।
ঈদ শুধু উৎসবের নয়, দায়িত্বেরও সময়
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী আহসানুল একরাম মুর্তজা বলেন, ‘কিছু উৎসব শুধু আনন্দ দেয়, আর কিছু উৎসব মানুষকে ভাবতে শেখায়। কোরবানির ঈদ আমার কাছে সেই বিরল উপলক্ষগুলোর একটি। একজন ভেটেরিনারিয়ান হিসেবে কোরবানির প্রেক্ষাপট শুধু উৎসবের নয়, দায়িত্বেরও সময়। কোরবানির সময় পশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে যে তৃপ্তি পাই, ঈদের আনন্দকে আরও অর্থবহ করে তোলে। কোরবানির ঈদকে বিশেষ করে তোলে এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা, ত্যাগ, সহমর্মিতা এবং ভাগাভাগি করে নেওয়ার মানসিকতা। একাডেমিক ব্যস্ততা শেষে পরিবারের কাছে ফিরে আসার অনুভূতি যেন সব ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর করে দেয়। ঈদের দিনটি আমি পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটিয়েই উপভোগ করতে ভালোবাসি। ব্যক্তিগতভাবে ঈদের সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি আসে ঘরের ভেতর থেকে, মায়ের হাতে রান্না করা গরুর মাংসের পরিচিত ঘ্রাণ। পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়া, আর আপন মানুষদের হাসিমুখ-এসবের মধ্যেই যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ লুকিয়ে থাকে। তাই আমার কাছে কোরবানির ঈদ কোনো একদিনের উৎসব নয়, এটি দায়িত্বের গর্ব, পরিবারের উষ্ণতা।’
কোরবানির ঈদ ত্যাগ, কৃতজ্ঞতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়
কৃষি অনুষদের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান অরিন বলেন, ‘আমার কাছে কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিবার, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং একসাথে থাকার এক অনন্য উপলক্ষ। সারা বছরের ব্যস্ততার মাঝে এই সময়টুকু পরিবারের সবাইকে কাছে পাওয়ার আনন্দ যেন অন্য সব আনন্দকে ছাপিয়ে যায়। প্রিয়জনদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা, খোঁজখবর নেওয়া, ছোট ছোট সুখের মুহূর্ত ভাগাভাগি করে নেওয়া-এসবই ঈদকে আরও অর্থবহ করে তোলে। কোরবানির ঈদ অন্তরকে বিশেষভাবে স্পর্শ করে, কারণ এটি আমাদের ত্যাগ, কৃতজ্ঞতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়। আর ঈদের সবচেয়ে আবেগঘন অনুভূতিগুলোর একটি হলো মায়ের হাতে রান্না করা গরুর মাংসের স্বাদ। ক্যাম্পাসের হোটেলগুলোতে খাওয়া আর বাসায় মায়ের হাতে। সেই রান্নার ঘ্রাণে যেমন থাকে উৎসবের আমেজ, তেমনি প্রতিটি পদে মিশে থাকে মায়ের অগাধ স্নেহ ও ভালোবাসা। তাই ঈদ আমার কাছে শুধু একটি দিন নয়, বরং হৃদয়ে জমে থাকা অসংখ্য ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও সুখের অনুভূতির নাম।’
সকলের মাঝে ত্যাগ, সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে যাক
কৃষি অনুষদের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী আহমদ মুজতাবা হামীম বলেন, ‘ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। কোরবানির ঈদে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি দেওয়া হয়। ঈদের দিন সকালে সবাই একসাথে ঈদের জামাত আদায় করে একে অপরের সাথে হাসিমুখে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করা হয়। তারপর যথাযথভাবে নির্ধারিত পশু কোরবানি দিতে হবে। কোরবানির তিন ভাগের একভাগ গরীব দুঃখীত অসহায়দের মাঝে বিতরণ করতে হবে। এটাই কোরবানির আসল মহত্ত্ব, ধনী গরীব সকলের মাঝে ত্যাগ, সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে যাক- এটাই কোরবানির ঈদের মূল শিক্ষা। ঈদের বিশেষ সময় পার হয় পরিবার পরিজন নিয়ে। এদিন বিভিন্ন জায়গায় আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় গিয়ে তাদের সাথে সুন্দর সময় কাটানো, বাইরে ঘুরতে যাওয়া সব মিলিয়ে সুন্দর দিন পর হয়। ঈদের আসল উদ্দেশ্য সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। সবারই ঈদ অনেক সুন্দর ও নিরাপদ কাটুক এই দোয়া করি। সবাইকে ঈদ মোবারক।’
ঈদে দূরপাল্লার শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার গল্প
মাৎসবিজ্ঞান অনুষদের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী আফিফ হুসাইন বলেন, ‘ঈদের ছুটি মুলত শুরু হয় বাস বা ট্রেনের টিকেট কাটার দিন থেকে। প্রতিটা মুহুর্ত যেন এক একটা দিনের মতো মনে হয়। কখন যে ক্লাস শেষ হবে? কখন যে বসায় যাবো?। ক্লাস, ল্যাব থেকে শুরু করে টংয়ের আড্ডা কোথাও মন বসে না ঈদের ছুটি কাছাকাছি হলে। এটি মুলত বাসা থেকে দূরে থাকা প্রতিটা মানুষের কথা। তবে দূর এলাকায় যাদের বাসা তারা জানে ক্যাম্পাস থেকে বাসায় আসা রীতিমতো একটা যুদ্ধের চেয়ে কিছু কম নয়। বাস, ট্রেনে রীতিমতো সংগ্রাম করে বাসায় যেতে হয়। তবুওঈদের ছুটিটা আমাদের কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। ক্যাম্পাস থেকে নিজ এলাকায় আসার পথটা খুব বড় লাগে। বার হাত ঘড়ির দিক তাকাই আর ভাবতে থাকি ‘এই তো আর মাত্র কয়েক ঘন্টা’। তবে বাসায় এসে পরিবারের সাথে কিছুক্ষণ আবেগঘন মুহুর্ত সকল ক্লান্তি যেনো নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। একটি বিষয় এই ঈদ শুধু কুরবানির পশু জবাই নয়, প্রকৃত ত্যাগ হলো নিজের স্বার্থ, অহংকার, লোভ ও হিংসাকে বিসর্জন দেওয়া। সমাজে স্বার্থপরতা, হিংসা ও বিভেদ দিন দিন বাড়ছে। তাই প্রয়োজন ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা।’



মন্তব্য