![]()
বাকৃবি প্রতিনিধি
‘হাওরে আগাম বন্যার গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাওরে আকস্মিক বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি মে মাসে (প্রায় ৫০ শতাংশ)। এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ এবং মার্চের শেষভাগে ও এপ্রিলের প্রথমার্ধে তুলনামূলক কম প্রকোপ দেখা গেছে। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কাটতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমে। এ পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষ এবং বন্যার পূর্বেই ফসল কর্তনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।
আজ সোমবার (৪ মে) দুপুরে হাওরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষে সুবিধা সম্পর্কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানা গবেষণা দলের প্রধান গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো হাবিবুর রহমান। এসময় উপস্থিত ছিলেন গবেষণার সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।
গবেষকরা জানায়, ‘দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বোরো মৌসুমে। আর মোট বোরোধানের উৎপাদনের ১৮ শতাংশ হাওরাঞ্চলে উৎপন্ন হয়। তবে প্রায় প্রতিবছর আগাম বন্যায় ধানের ১০ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশই ফসল ক্ষতির মুখে পরে। যেহেতু হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান। এ পরিস্থিতিতে বন্যা শুরুর আগেই যদি ধান কর্তন করা যায় তাহলে বন্যা থেকে ধানের ফসল পরিত্রাণ পাবে। এক্ষেত্রে হাওরে প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি বোরোধানের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত চাষ করতে হবে। কারণ এসব ধান ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই পেকে যায়। ফলে বন্যা নামার আগেই ফসল কেটে নেওয়া সম্ভব হয়।’
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো হাবিবুর রহমান প্রামানিক বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে নিরাপদ বোরোধান উৎপাদনে স্বল্পমেয়াদি ধান জাতের জনপ্রিয়করণ’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণা ২০২০ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য বন্যার আগেই পরিপক্ক ফসল কর্তন। এক্ষেত্রে হাওরে মূলত বোরোধানই একমাত্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারির শুরুতে ধান লাগানো হয়। প্রচলিত জাতের ধান বড় হতে এপ্রিলের শেষ বা মে মাস এসে যায়। তখনি হঠাৎ বন্যার পানি নেমে আসে। এতে পুরো ফসল পানিতে ডুবে যায়। কৃষকেরা শেষ সময়ে এসে ফসল ঘরে তুলতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আগাম বন্যা বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে শুরু হয়। কোনোভাবে যদি এর আগেই ধানের ফসল কর্তন করা যায়, তাহলে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। এই চিন্তা থেকে আমরা হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষ করছি। দেখা যায়, প্রচলিত বোরোধানের তুলনায় স্বল্পমেয়াদি জাত ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই কর্তন সম্ভব। এতে বন্যায় সমসাময়িক থেকে কিছুটা আগেই কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারবে।’
ওরে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত নিয়ে অধ্যাপক প্রামাণিক বলেন, ‘হাওরে বহুল চাষকৃত ব্রি ধান ৯২, যার জীবনকাল ১৬০। ডিসেম্বরের শেষের দিকে এ জাতের ধান রোপণ করা হয়। তবে ধান পরিপক্ক হতে এপ্রিলের শেষ বা মে মাস লেগে যায়, যে সময়টায় বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে কিন্তু স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন ব্রি ধান-৮৮, ব্রি ধান-১০১, ব্রি ধান-১১৩, ব্রি ধান-১০৫ ও ব্রি ধান-২৫ চাষ করলে একই সময়ে রোপণ করেও আগেই ফসল তোলা যায়।’
স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এসব জাতের জীবনকাল প্রায় ১৪৫ দিনের মতো। একই সময়ে রোপণ করে হাওরে প্রচলিত ধানের জাতের চেয়ে ১৫ দিন আগেই কর্তন করা যায়। বেশিরভাগ সময় এপ্রিলের প্রথমার্ধে ফসল পরিপক্ক হয়ে যায়, ফসল কর্তন করা যায়।
এ পদ্ধতিতে চাষে সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ব্রি ধান ৮৮ জাত ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করে এপ্রিলের ৮ তারিখে কর্তন করতে পেরেছি। এতে বন্যার ক্ষতি থেকে ফসল মুক্ত। এর আগে সুনামগঞ্জে বন্যা আসার আগেই ধান কেটে ফেলতে পেরে কৃষকেরা খুশি। অষ্টগ্রামে ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ২৫ এর চারা ২ জানুয়ারি লাগিয়ে এপ্রিলের ১২ তারিখে কর্তন করা গেছে। এ আর ইটনাতে স্বল্পমেয়াদি জাত ব্রি ধান ১১৩ জানুয়ারির ১০ তারিখে রোপণ করে ১৭ এপ্রিলের কর্তন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ব্রি ধান ৯২ এখনো কর্তন সম্ভব হয়নি।’
হাওরে বোরোধান উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘হাওরে বোরোধান চাষে বন্যার পাশাপশি আরও সমস্যা রয়েছে। যদি থোড় আসার সময় বাতাসের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রীর কম হয় তাহলে ধান চিটা হবে। আবার ফুল আসার সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রীর বেশি হলে চিটা হবে। আবার বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হয়। শিলাবৃষ্টিতে গাছের ক্ষতি হয়। তাই এমন সময়ে ধান বপণ করতে হবে যাতে ন্যূনতম এসব ক্ষতি এড়ানো যায়। এক্ষেত্রে অবশ্যই ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে।’
তবে নেতিবাচক দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদী ধানে উৎপাদন এক থেকে দেড় টন মতো কম হওয়ার কারণে কৃষক অনুৎসাহী হয়ে পড়েন। দীর্ঘমেয়াদী ধানে বন্যায় পড়লে ১০০ভাগ ধানই ক্ষতির মুখে পড়বে এটি তারা বুঝতে চান না অনেকসময়।
সরকারিভাবে এই বিষয়গুলো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। তীব্র ঝুঁকির থেকে ঘরে ফসল তোলা গুরুত্বপূর্ণ।’



মন্তব্য