![]()
বেরোবি প্রতিনিধি
এক মাসের সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতর আসে মুসলিম উম্মাহর জীবনে আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। এই উৎসব কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের সমাপ্তি নয়, বরং এটি পরিবার, ভালোবাসা ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য মিলনমেলা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদ মানে ব্যস্ত ক্যাম্পাস জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের কাছেও ঈদ একটি বিশেষ আবেগের নাম। তাদের কাছে ঈদ মানে শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সান্নিধ্য, বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলন এবং নতুন উদ্যমে পথচলার অনুপ্রেরণা।
পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মাতুজ্জাহান মুন বলেন, “আমার কাছে ঈদ শুধু নিজের আনন্দ উদযাপনের একটি দিন নয়, বরং এটি অন্যদের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বিশেষ করে যারা সমাজে অসচ্ছল বা সুবিধাবঞ্চিত, তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি কাজ করে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। রমজানের এক মাস আমরা আত্মসংযম ও সহমর্মিতা শিখি, আর ঈদের দিন সেই শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ পাই। আমি মনে করি, ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ এই আনন্দে শামিল হতে পারে।”
ভুগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ নিয়ামতউল্লাহ ইমন বলেন, “ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ আমার কাছে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া। সারা বছর পড়াশোনা ও নানা ব্যস্ততায় আমরা অনেকেই পরিবার থেকে দূরে থাকি, ফলে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু ঈদের সময়টা যেন সেই দূরত্বকে মুছে দেয়। একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা, ছোটদের আনন্দ দেখার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি আছে। আমার কাছে ঈদ মানে এই পারিবারিক বন্ধনের পুনর্মিলন, যা আমাদের মানসিকভাবে অনেক শক্তি দেয়।”
জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তামজিদা খাতুন তিশা বলেন, “ঈদ এলেই আমার মনে প্রথম যে অনুভূতিটা আসে, তা হলো গ্রামের বাড়িতে ফেরার আনন্দ। শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহল থেকে বের হয়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশে গেলে মনে হয় যেন এক অন্য জগতে চলে এসেছি। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা, শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সবকিছু মিলিয়ে ঈদের আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছোটবেলার স্মৃতিগুলো তখন আবার নতুন করে মনে পড়ে, যা ঈদের অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে।”
ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম নাঈম বলেন,“আমার কাছে ঈদ মানে নতুনভাবে শুরু করার একটি অনুপ্রেরণা। রমজানের পুরো মাস জুড়ে আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে ভেতরের খারাপ দিকগুলো দূর করতে চাই। ঈদ সেই প্রচেষ্টার একটি আনন্দঘন সমাপ্তি হলেও, এটি একই সঙ্গে নতুন করে জীবনকে গুছিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগও তৈরি করে। আমি ঈদের সময়টা নিজের লক্ষ্যগুলো নতুনভাবে নির্ধারণ করার এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে আরও প্রস্তুত করার একটি সময় হিসেবে দেখি।”
দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “ঈদ আমার কাছে এক ধরনের আবেগ ও স্মৃতির মিশেল। ছোটবেলায় ঈদের যে আনন্দ ছিল—নতুন জামা, সকালে সেমাই খাওয়া, সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়—এসব এখনো মনে পড়ে খুব স্পষ্টভাবে। সময়ের সাথে সাথে আমরা বড় হয়েছি, দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু সেই শৈশবের সরল আনন্দটাকে এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করি। আমার কাছে ঈদ মানে অতীতের সুন্দর স্মৃতিগুলোকে মনে করা এবং বর্তমানকে সেই আনন্দ দিয়ে রাঙিয়ে তোলা।”
একই বিভাগের শিক্ষার্থী হুমায়রা আনিসা বলেন, “ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের সমাজে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় মানুষ একে অপরের খোঁজ নেয়, ভুল বোঝাবুঝি দূর করে এবং সম্পর্কগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলে। আমি মনে করি, যদি আমরা ঈদের এই ইতিবাচক চেতনাকে সারা বছর ধরে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের সমাজ আরও সুন্দর ও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। ঈদ আমাদের সেই শিক্ষা দেয়, যা আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।”
সবমিলিয়ে, বেরোবি শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি, দায়িত্ববোধ এবং নতুন সম্ভাবনার এক সমন্বিত প্রকাশ। এই উৎসব তাদের জীবনে এনে দেয় প্রশান্তি, ভালোবাসা ও নতুন করে পথচলার শক্তি।



মন্তব্য