![]()
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদকে আইনি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত গণভোট। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এই গণভোটকে ঘিরে সারাদেশে বিরাজ করছে নীরব উত্তেজনা। শ্রেণিকক্ষ, হলের বারান্দা কিংবা টিএসসির চায়ের আড্ডা সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে এখন ‘জাতীয় নির্বাচন’ ও ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে উঠে আসছে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণভোটের গুরুত্ব ও তারুণ্যের প্রত্যাশার কথা।
একটি কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’
কৃষি অনুষদের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী ছাব্বির হোসেন রিজন বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রয়োজন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মূলত প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষ অবস্থান নেওয়া। এটি নতুন ধারার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাংবিধানিক সংস্কারের পথ খুলে দিবে। গণভোটে হ্যাঁ এজন্য দিতে হবে, যেনো সনদে উল্লিখিত সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। পুরোনো বন্দোবস্তের পরিবর্তে একটি নতুন ও কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। গণভোট শুধু ভোট নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়নে অংশ। বলতে চাই ‘অন্ধ অনুসরণ নয়, সমালোচনামূলক চিন্তা, বিভাজন নয়, দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ’। তাই তারুণ্যের অংশগ্রহণ গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে হোক।’
‘হ্যাঁ’ ভোট সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব
একই অনুষদের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান কৌশিক বলেন, ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের নেতৃত্বে জবাবদিহিতা, ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন। বিগত সতেরো বছরের ফ্যাসিস্ট রেজিমের খুন, গুম ও রাহাজানির শিকার মানুষের ন্যায়বিচার ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্তরায় ছিল। এখন সময় এসেছে উত্তরণের, সেটি হলো গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল ছাত্রসমাজ, ছিল জনতার ভিড়। রিকশাচালক, শ্রমিক, দিনমজুর, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। ফলে আমরা এক ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য অধিকার আদায়ের করতে গিয়ে কেউ জীবন দিয়েছে, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। তাদের রক্তের বিনিময়েই আমরা পেয়েছি এক স্বাধীন, ফ্যাসিস্টবিহীন বাংলাদেশ। জুলাই হেরে গেলে, হেরে যাবে বাংলাদেশ। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে থাকা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
শক্তিশালী বিরোধী দল পেতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’
মাৎসবিজ্ঞান অনুষদের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আফিফ হুসাইন বলেন, ‘দেশের উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারি দলের সাথে, শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন।
একটি রাষ্ট্রের পরিচালনায় থাকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল। যাকে সেই রাষ্ট্রের সরকার বলা হয়। রাষ্ট্র সচল ও কার্যকরভাবে চলতে সরকারি দলের পাশাপশি শক্তিশালী বিরোধী দল একান্ত জরুরি। সরকারের ভুল পদক্ষেপ সংশোধনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজন গঠনমূলক সমালোচনা। কিন্তু বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনামলে আমরা একটি ডামি বিরোধী ছিল। যাদের কথার কোনো গুরুত্ব ছিল না। সরকারি দল যা বলতো তাই হতো দেশে। যার ফলে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার মারাত্মক অভাব ছিল, ছিল না কোনো জবাবদিহিতা। পরবর্তীতে এটি রূপ নেয় উন্নয়নের নামে অবৈধ দেশবিরোধী চক্রান্তে। এখন সময় এসেছে এটি রুখে দেবার। প্রয়োজন সরকারি দলের পাশাপাশি একটি সুগঠিত ও শক্তিশালী বিরোধী দল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাশ করলে এই পথ সুগম হবে।’
আজকের সিদ্ধান্ত নয়, সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার সুযোগ
কৃষি অনুষদের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী তাহমিনা তাকি বলেন, ‘এই গণভোটে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্ন নয়। বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং নাগরিক অধিকারের জন্য একটি বড় সিদ্ধান্ত। গণভোট মূলত জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর আইনি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার পন্থা। যেখানে থাকবে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সীমিতকরণ, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সরকার ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে বহুপক্ষীয় কমিটি গঠন। থাকবে বিচার বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক স্বাধীনতা, দুই-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাশ হওয়া মানে সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের সম্মতি। তবে ‘না’ ভোট দেওয়াও নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তবে এই সিদ্ধান্ত যদি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এটি থেকে বিরত থাক নৈতিক দায়িত্ব। তাই গনতান্ত্রিক চর্চা আরও গভীরতর করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষায় তারুণ্য শক্তিসহ জনসাধারণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে থাকবে এটাই প্রত্যাশিত।’
গণভোটে ‘হ্যাঁ’, বৃহত্তর স্বার্থে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী আবির হোসেন বলেন, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে তরুণ প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। আসন্ন গণভোট রয়েছে সেই স্বপ্নকে একটি স্বচ্ছ ও স্থায়ী কাঠামোয় রূপ দেওয়ার সুযোগ। ব্যক্তিগতভাবে জুলাই সনদ প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এক বাংলাদেশের প্রত্যাশা করি যেখানে বংশ পরিচয় নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে জিম্মি হবে না। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের স্থায়ী বিধান ভোটাধিকারকে আইনি সুরক্ষা দেবে। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যা আমরা হারিয়েছিলাম। এখন সুযোগ এসেছে পুরোনো শাসন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের। নাগরিক হিসেবে বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার আমাদের আছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে দাঁড়ানোই বৃহত্তর স্বার্থে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।’
নতুন রূপে ফ্যাসিস্ট না পেতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’
পশুপালন অনুষদের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী মোছা. মোতমাইন্না মুন্নী বলেন, ‘আসন্ন গণভোট দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ। দেশে পুরোনো ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকবে নাকি সমতার ও ন্যায়ের রাষ্ট্রে রূপ নিবে, তার নির্ধারণের সুযোগ। এটা বলছি কারণ আমাদের সাংবিধানিক কাঠামো এমন যা সরকারি দলকে ফ্যাসিস্ট হতে বাধ্য করে। দেশের জনতা খুব নিবিড়ভাবে তা প্রত্যক্ষ করেছে বিগত সময়। এরশাদ আমল, হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। যেখানে ছিল না সাধারণদের বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গুম, খুন, ধর্ষণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা । যার দরুন গত চব্বিশে আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট পলায়ন করেছে। আমরা আবার নতুন রূপে ফ্যাসিস্ট পেতে চাইনা। এজন্য জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো আইনি কাঠামোয় রূপ পেতে হবে। যেটা একমাত্র সম্ভব গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাশ করলে। আপামর জনগণের কাছে প্রত্যাশা নতুন জবাবদিহি, দায়বদ্ধ ও ন্যায়ের বাংলাদেশ পেতে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে থাকতে।’



মন্তব্য