সোমবার, ১ জুন ২০২৬
 

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের কৃষি

JK0007
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২২

---
অর্ঘ্য চন্দ, সিকৃবি প্রতিনিধি: বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে বহুল আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। কোনও একটি জায়গায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়ার যে গড়-পড়তা ধরন, তাকেই বলা হয় জলবায়ু। আবহাওয়ার সেই চেনাজানা ধরন বদলে যাওয়াকেই বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন।

পৃথিবী ক্রমশ গরম হয়ে পড়ছে এবং তার ফলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার বহুদিনের চেনাজানা আচরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ুর এই পরিবর্তনে বদলে যাবে আমাদের জীবন যাপন।
তৈরি হবে পানির সঙ্কট । কঠিন হয়ে পড়বে খাদ্য উৎপাদন। কোনো কোনো অঞ্চল বিপজ্জনক মাত্রায় গরম হয়ে পড়বে, এবং সেই সাথে সমুদ্রের পানি বেড়ে বহু এলাকা প্লাবিত হবে। ফলে সে সব জায়গা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া,অতিরিক্ত গরমের পাশাপাশি ভারি বৃষ্টি এবং ঝড়ের প্রকোপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকবে। ফলে মানুষের জীবন এবং জীবিকা চরম হুমকিতে পড়বে। গরীব দেশগুলোতে এসব বিপদ মোকাবেলার সক্ষমতা কম বলে তাদের ওপর এই চরম আবহাওয়ার ধাক্কা পড়বে সবচেয়ে বেশি।

তাপমাত্রা বাড়ায় উত্তর মেরুর জমাট বাধা বরফ এবং হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে সাগরের উচ্চতা বেড়ে উপকুলের নিচু এলাকাগুলো ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া সাইবেরিয়ার মত অঞ্চলে মাটিতে জমে থাকা বরফ গলতে থাকায় বরফের নিচে আটকে থাকা মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে, মিথেনের মত আরেকটি গ্রিনহাউজ গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে।

প্রাকৃতিক কারণে জলবায়ুতে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পরিবর্তন হয়। কিন্তু যে মাত্রায় এখন তাপমাত্রা বাড়ছে তার পিছনে মানুষের কর্মকাণ্ডই প্রধানত দায়ী। মানুষ যখন থেকে কল-কারখানা এবং যানবাহন চালাতে বা শীতে ঘর গরম রাখতে তেল, গ্যাস এবং কয়লা পোড়াতে শুরু করলো সেই সময়ের তুলনায় পৃথিবীর তাপমাত্রা এখন ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে।

বায়ুমণ্ডলে অন্যতম একটি গ্রিন হাউজ গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ উনবিংশ শতকের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।। গত দুই দশকে বেড়েছে ১২ শতাংশ। বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণেও বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে। গাছপালা কার্বন ধরে রাখে। ফলে, সেই গাছ যখন কাটা হয় বা পোড়ানো হয়, সঞ্চিত সেই কার্বন বায়ুমণ্ডলে নিঃসরিত হয়।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবহাওয়ার মৌসুমি ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতাই এর মূল কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সব খাত বিশেষ করে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কৃষি উৎপাদন, প্রাকৃতিক পরিবেশসহ জনকল্যানমূলক সব সেবাখাত এবং খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা ব্যাহত করবে আমাদের ধারাবাহিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে।

বাংলাদেশেও আবহাওয়ার বিরূপ আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূত্রানুযায়ী, এই বছর জুলাই মাসে গড় বৃষ্টিপাত ইতিহাসে সবচেয়ে কম। শতকরা ৫৭.৬ ভাগ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় খরা দেখা দিচ্ছে। অথচ বর্ষা শুরুর আগেই অকস্মাৎ ভীষণ বৃষ্টিতে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছিলো সেসব অঞ্চল।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের দেশে এখনো প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১৬ শতাংশের কাছাকাছি। কৃষি আবহাওয়ার সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। আবহাওয়ার যেকোনো পরিবর্তন, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বন্যা, মাটির লবণাক্ততা ইত্যাদি সরাসরি ব্যাহত করে কৃষি উৎপাদনকে। তাই ভবিষ্যৎ কৃষির প্রশ্নে প্রধান চ্যালেঞ্জ জলবায়ুর পরিবর্তন।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ স্থলভাগ তলিয়ে যেতে পারে। এমনটা হলে ব্যাপক পরিমাণ চাষযোগ্য জমি তলিয়ে যাবে,সেইসাথে গৃহহারা হবে সাড়ে ৩ কোটির মতো মানুষ। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের কৃষক প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কৃষিজমি ক্রমাগত কমে যাওয়ার ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় কৃষিতে সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলবে। যা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমুদ্রোপকূলবর্তী এলাকা থেকে ভিতরের এলাকাগুলোর মাটিতেও লবনাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে উর্বরতা হ্রাস পায়, ফলে শস্যের উৎপাদন কমে যায়। বাংলাদেশের মোট কৃষিজমির ৩০ শতাংশই উপকূল এলাকায় অবস্থিত। বিশ্বব্যাংক এক গবেষণা প্রতিবেদনে আশংকা করেছে, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে উচ্চফলনশীল ধানের ফলন ১৫.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলবাসী মারাত্নক ঝুকিতে রয়েছে। এছাড়াও এদের বাসস্থান হারানোর মাধ্যমে পরিণত হতে পারে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে।

বাংলদেশের মানুষ বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা,খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদির সাথে লড়াই করেই টিকে আছে। তাই পরিস্থিতি খারাপের দিকে ধাবিত হওয়ার আগেই সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিত সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।সেই সাথে বাড়াতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিজ্ঞান ও কৌশলের ব্যবহার।

উন্নত দেশগুলো বর্তমানে কৃষিতে যন্ত্র ও প্রযুক্তিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তাই আমাদের কৃষিকে আধুনিকায়ন করার এখনই উপযুক্ত সময়। জলবায়ুর এ বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ করে বিভিন্ন অভিযোজন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে, যাতে করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো যায়। এছাড়া দুর্যোগমুক্ত সময়ে শস্য বহুমুখীকরণ ও ফসলের নিবিড়তা বাড়িয়ে দুর্যোগের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যেতে পারে। দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের কাজে লাগিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বের করতে হবে কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশেও খাদ্য উৎপাদন ঠিক রাখা যায়।

মন্তব্য

সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর

Developed By: Dotsilicon