![]()
ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে ফিফা এবং এর বাণিজ্যিক অংশীদাররা পর্দার আড়ালে যে ‘গেম প্ল্যান’ তৈরি করে, তা সরাসরি কোনো কারচুপির চেয়েও বেশি কৌশলী এবং পদ্ধতিগত। জনপ্রিয় দলগুলোকে টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার বা তাদের জন্য পথ সহজ করার এই প্রক্রিয়াটিকে “স্ট্র্যাটেজিক ড্রয়িং অ্যান্ড শিডিউলিং” (Strategic Drawing & Scheduling) বলা হয়।
রেফারিং ও ‘গেম ম্যানেজমেন্ট’
এটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। সরাসরি দুর্নীতি না হলেও, রেফারিরা অনেক সময় বড় দলের ক্ষেত্রে ‘সহনশীল’ আচরণ করেন।
মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট: ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেনাল্টি দেওয়া বা কার্ড দেখানোর ক্ষেত্রে রেফারিদের একটি ‘অদৃশ্য চাপ’ থাকে। বড় দলের একজন তারকা খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হলে টিভির দর্শকসংখ্যা ও ব্যবসার ওপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই রেফারিরা অনেক সময় ছোট দলের ভুলের প্রতি কঠোর এবং বড় দলের ভুলের প্রতি কিছুটা নমনীয় থাকেন।
গ্লোবাল মার্কেটিং ও পিআর (PR) স্ট্র্যাটেজি
ফিফা এবং স্পন্সররা বিশ্বকাপের ব্র্যান্ডিং করার সময় নির্দিষ্ট কিছু তারকার মুখ ব্যবহার করে।
ভয়ংকর প্রভাব: এই তারকাদের নিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্যাম্পেইন আগে থেকেই তৈরি থাকে। যদি তারা গ্রুপ পর্বে বিদায় নেয়, তবে ওই বিনিয়োগের অপচয় হয়। তাই ফিফা এমন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে যাতে এই তারকাদের দলগুলো কোনোভাবে নকআউট পর্বের অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়। এর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন থেকে শুরু করে মিডিয়া হাইপ—সবকিছু পরিকল্পিত থাকে।
গ্যাম্বলিং ও বেটিং ইন্ডাস্ট্রির অস্থিরতা
বিশ্বের বেটিং ইন্ডাস্ট্রি কোটি কোটি ডলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জনপ্রিয় দলগুলো টুর্নামেন্টে টিকে থাকলে বাজিকরদের আগ্রহ ও লেনদেন অনেক বেশি থাকে।
অনিশ্চয়তা: বড় দলগুলো বিদায় নিলে বাজিকরদের মধ্যে বাজি ধরার আগ্রহ কমে যায়, কারণ তাদের কাছে ওই টুর্নামেন্টটি তখন আর আগের মতো ‘প্রেডিক্টেবল’ বা আকর্ষণীয় থাকে না। এতে বেটিং ওয়েবসাইটগুলোর ট্রানজেকশন ভলিউম উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
গ্লোবাল রিটেইল ও মার্চেন্ডাইজিং চেইন
বিশ্বজুড়ে জার্সি, বুট এবং লাইসেন্সকৃত পণ্যের একটি বিশাল বাজার থাকে। বড় দলের সমর্থকরা আবেগপ্রবণ এবং তারা দলের সাথে সাথেই বিভিন্ন পণ্য কেনেন।
ক্ষতির গভীরতা: একটি জনপ্রিয় দল যখন গ্রুপ পর্বে বাদ পড়ে, তখন ওই দলের সাথে সম্পর্কিত পণ্যের স্টক বা ইনভেন্টরি অবিক্রিত থেকে যায়। খুচরা বিক্রেতারা এরপর ওই পণ্যের ওপর বড় ধরনের ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য হয়, যা পুরো সাপ্লাই চেইনের প্রফিট মার্জিন কমিয়ে দেয়। এটি সরাসরি প্রভাব ফেলে অ্যাডিডাস বা নাইকির মতো কোম্পানিগুলোর কোয়ার্টারলি আয়ের ওপর।
মিডিয়া ইমপ্যাক্ট ও ‘প্রাইম টাইম’ অর্থনীতির ধস
বিশ্বব্যাপী ব্রডকাস্টিং সংস্থাগুলো (যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স স্পোর্টস বা লাতিন আমেরিকার টিভি চ্যানেলগুলো) তাদের বিজ্ঞাপনের প্যাকেজগুলো সাজায় জনপ্রিয় দলগুলোর খেলার সময়ের ওপর ভিত্তি করে।
আর্থিক ক্ষতি: মেসি বা নেইমারের মতো তারকারা যখন খেলেন, তখন টিভির দর্শক সংখ্যা (Viewership) আকাশচুম্বী থাকে। তারা বিদায় নিলে দর্শকসংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। ফলে ব্রডকাস্টারদের ‘অ্যাডভার্টাইজিং স্লট’গুলোর দাম পড়ে যায়। অনেক সময় স্পন্সররা তাদের চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দাবি করে, কারণ তাদের বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাশিত সংখ্যক দর্শক পায়নি।



মন্তব্য