![]()
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে টাকার বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগটি অবশেষে সরকারি তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উঠে আসার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে, ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল কোনোভাবেই এই রাষ্ট্রবিরোধী জালিয়াতির দায় এড়াতে পারেন না বলে মনে করছেন আইনজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহল। গত ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (স্থানীয় সরকার শাখা) থেকে এই জন্মসনদ জালিয়াতি বিষয়ে একটি দাপ্তরিক তদন্ত প্রতিবেদন (স্মারক নং-৭০২) ইস্যু করা হয়। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, জন্ম নিবন্ধন সনদ পাওয়া ৩ জন ব্যক্তি ফতেহাবাদ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা নন এবং স্থানীয় কেউ তাদের চেনেন না বা সেখানে বসবাস করেন না।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন এবং সাবেক ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন যে, তারা সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যের প্রত্যয়নের ভিত্তিতে এই সনদগুলো ইস্যু করেছেন। জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই ৩টি ভুয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ বাতিলের সুস্পষ্ট সুপারিশ করেছেন। প্রাথমিকভাবে এই ৩টি সনদের কথা সামনে এলেও, নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে ওই ইউনিয়ন থেকে একইভাবে আরও প্রায় ৪৩টি ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ইস্যু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এমন আরও ২৩টি নিবন্ধনের খোঁজ পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। স্থানীয় সরকার আইন ও জন্ম নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী, জন্ম নিবন্ধনের সরকারি সার্ভারের ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে চেয়ারম্যান এবং সচিবের (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) নিয়ন্ত্রণে থাকে। চূড়ান্ত অনুমোদনকারী হিসেবে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া ভিনদেশি নাগরিকদের জন্মসনদ ইস্যু করার পর, শুধুমাত্র “ইউপি সদস্যের প্রত্যয়ন ছিল” এমন অজুহাত দেখিয়ে সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোনোভাবেই আইনগত বা প্রশাসনিক দায় এড়াতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মতো এত স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে এমন অবহেলা ও জালিয়াতি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের শামিল। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত ৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর ইতোমধ্যে বেশ কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও উপজেলা বা জেলা প্রশাসন এখন পর্যন্ত দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। রাষ্ট্রবিরোধী এমন একটি অপরাধ সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধি কীভাবে নিজ পদে বহাল তবিয়তে থাকেন এবং প্রশাসন কেন দৃশ্যমান ফৌজদারি ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে শফিউল আলম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা প্রথম এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
ওই অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল ও ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলাম যোগসাজশ করে প্রতিটি নিবন্ধনের জন্য ৩ লাখ টাকা করে মোট ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে ৩ জন রোহিঙ্গাকে (সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ, মুবিনা খাতুন ও হাফিছা) জন্ম নিবন্ধন দিয়েছেন। শফিউল আলম সে সময় তার অভিযোগে এই অবৈধ জন্ম নিবন্ধন বাতিল ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তার কারণে নিজের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন। শফিউল আলমের সেই অভিযোগই আজ সরকারি তদন্তে অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, এখন কেবল প্রশাসনের কঠোর আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন রুহুলের সাথে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তার সাথে কোনোভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।



মন্তব্য