নলডাঙ্গা (নাটোর) প্রতিনিধি
তুমি যদি দৃশ্যমান মানুষকেই ভালোবাসতে না পারো,তবে অদৃশ্যমান ঈশ্বরকে কি করে ভালোবাসবে? মাদার তেরেসার এই মহান উক্তিটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে কয়জনই বা মনে রাখে। তবে তার এই মহান উক্তিটি বিশ্লেষণ করলে মানবজাতির অনেক কিছু শেখার রয়েছে।
কেউ যখন ক্ষমতার পরিবর্তনের গল্প লেখেন, তখন কেউ কেউ নীরবে লিখে যান ত্যাগের ইতিহাস। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী কাজী বাবলুর জীবন যেন সেই ইতিহাসেরই এক প্রতিচ্ছবি।
দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল-জুলুম, মামলা, নির্যাতন—সবকিছুর সাক্ষী তিনি। রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মিছিল-মিটিংয়ে ছিলেন সামনের সারিতে। কিন্তু সেই দীর্ঘ পথচলার মূল্য দিতে গিয়ে হারিয়েছেন শিক্ষকতার চাকরি, অর্থ-সম্পদ এবং জীবনের বহু স্বাচ্ছন্দ্য।
পরনে সস্তা দামের পোষাক,অথচ তিনি একজন পরিক্ষিত রাজনীতিবিদ,অনেক কিছু করার সুযোগ থাকলে,সেই অসৎ পথকে তিনি দূরে ঠেলে দিয়ে এখনও নিজে পরিশ্রম করে চলেছেন।
আজ,রাজনৈতিক মঞ্চে নয়—নিজের লেবুর বাগানে ঘাম ঝরাচ্ছেন তিনি। হাতে ঝুড়ি, গাছে গাছে লেবু সংগ্রহ করছেন। চার দশকের রাজনীতির একজন কর্মীকে এভাবেই খুঁজে পাওয়া যায় শ্রমের মাঝখানে।
একদিকে বর্তমানের লেবুর বাগানে শ্রম, অন্যদিকে দুঃসময়ের আন্দোলনের ছবি ও মিছিলের ভিডিও—দুটি দৃশ্য যেন একই মানুষের দুই অধ্যায়। একটি সংগ্রামের, অন্যটি আত্মমর্যাদার।
জানা যায়,কাজী বাবলু ১৯৮৪ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পতাকাতলে আনুষ্ঠানিকভাবে,রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ। ( প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ৫নং বিপ্রবেলঘড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রদল) ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ। নৃশংসভাবে প্রহৃত ও গ্রেপ্তার প্রথমবার রাষ্ট্রশক্তির নির্মমতা অনুভব। ১৯৮৯ সালে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে “সাহিত্য সম্পাদক” নির্বাচিত হয়ে ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের চরম উত্তাপে গভীর রাতে পিতা-মাতা ও ভাইবোনের সামনেই গৃহবন্দি অবস্থায় গ্রেপ্তার। পরিবার পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি সেই ভয়ঙ্কর শাসন।
১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বীরবলের মতো কৌশলগত ভূমিকা পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার। বিএনপি সরকার গঠন করলে মুক্তি পান। একই বছরে চাকরির জন্য দুটি হালের গরু বিক্রি করে এক নেতাকে টাকা দেন,চাকরিও হলো না, টাকা গেল—তবুও দলীয় আনুগত্যে অটল। ১৯৯২ সালে নাটোর সদর এবং নলডাঙ্গা উভয় এক আসন ছিলো সে সময়,ছাত্রদলের সহ-সভাপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব পুনরায় গ্রেপ্তার। নির্বাচনের পরে মুক্তি পান।
১৯৯৬-২০০১ –আওয়ামী লীগ শাসনামলে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির শিকার। প্রতিহিংসার চক্রে পড়ে রাজনীতির মূল্য চুকিয়েছেন বারবার। ২০০১ সালের নির্বাচনে পূর্বে আবারও গ্রেপ্তার,২০০২ সালে নলডাঙ্গা উপজেলা জাতীয়তাবাদী যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত। পরপর তিন মেয়াদে সভাপতি থেকে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন। ২০০৩ সালে নাটোর জেলা রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হয়ে মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে পুনরায় গ্রেপ্তার। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসী হামলায় পরিবারসহ ৯ জন আহত—গ্রামের বাড়িতে তাণ্ডব। ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে পুনরায় গ্রেপ্তার। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে পুনরায় গ্রেপ্তার।
২০১৯ সালে নাটোর জেলা কৃষকদলের সদস্য সচিব হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ৫ বছর দায়িত্ব পালন। ২০২২ সালে নয়াপল্টন আন্দোলনে অংশ নিয়ে মামলায় আসামি,আবার পুনরায় গ্রেপ্তার হন। ২০২৪- (৩০ অক্টোবর ) নাটোর থেকে পুনরায় গ্রেপ্তার। ১৯৮৪–২০২৪ (৫ আগস্ট পর্যন্ত) আওয়ামী লীগ সরকারের দমননীতির মামলা-হামলা রিমান্ডের শিকার হয়ে ১০ বার কারাবরন করেন। বিস্ফোরক, রাষ্ট্রদ্রোহী,ভোটের বাক্স ছিনতাই,ইত্যাদি রাজনৈতিক ২০ টির অধিক মামলা মোকাবিলা করেন,কাজী বাবলু।
মো: আব্দুল কুদ্দুস,আলতাফ হোসেন,সেকেন্দার আলীসহ স্থানীয়দের মতে-কাজি বাবলুকে আমরা, জনগণের সেবক হিসাবে দেখতে চাই। কাজী বাবলুর জীবন শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর গল্প নয়; এটি আদর্শ, ধৈর্য, ত্যাগ ও বিশ্বাসের দীর্ঘ এক যাত্রা ক্ষমতার পালাবদলের পরও যিনি নিজের পরিচয় খুঁজে নেন মাটির কাছেই।
সময়ই বলে দেবে—চার দশকের এই ত্যাগের ইতিহাস কেবল স্মৃতিতেই থাকবে, নাকি একদিন পাবে প্রাপ্য সম্মান ও মূল্যায়ন।
নির্যাতত নেতা কাজী বাবলু বলেন, “আমাদের দীর্ঘ ১৭ বছরের শ্রম, ত্যাগ আর সংগ্রামের মর্যাদায় আজ আমরা সরকারে আছি। এই মর্যাদা যেন কোনোভাবেই ব্যর্থতায় পরিণত না হয়। যারা দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, সেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের খোঁজ নেওয়া এবং তাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।



মন্তব্য