রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
 

রাঙ্গুনিয়ায় আবারও হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী

মাহবুবুর রহমান জিসান
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী ২০২৩

---

মুবিন বিন সোলাইমান, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটায় আবারও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে ও ৬ জনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে।

মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সরফভাটা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সৈয়দুরখীল এলাকায় এজাহার মিয়া ফকিরের বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তি একই এলাকার বাসিন্দা মো. হারুনের ছেলে মো. মোজাহেদ (৩২)। প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একজন বলেন, পরিকল্পিতভাবে নিহতের বড় ভাই দিদার (৩৮) এর উদ্দেশ্যে হামলা করতে আসলে অতর্কিতভাবে মোজাহেদের বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে কাঁদতে থাকে। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। অতিরিক্ত ব্লাড ব্লিডিং এর কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে জানান কর্তব্যরত ডাক্তার।

এ সময় একই এলাকার মৃত কেরামত আলীর ছেলে আবু তাহের (৩৫), বাদশা মিয়ার ছেলে মো. ফয়জুল্লাহ (২৫), মো. ইব্রাহীমের ছেলে মো. ফরহাদ (১৯), আবদুর রশিদের ছেলে মো. জামাল (২৫) এবং খায়ের আহাম্মদের ছেলে জালাল উদ্দীন (৩০) কে ধারালো রাম দা ও ছুরি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে সঙ্ঘবদ্ধ সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ।

সরফভাটা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ও ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মোনাফ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী হামলার কারণে সরফভাটায় খুন-করাবি, চাঁদাবাজি, রাহাজানি ও মাদকের অভয়ারণ্য করে গড়ে তুলেছে, এর থেকে পরিত্রাণ পেতে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা আওতাধীন পুলিশ বিট বসানো হলেও কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। সরফভাটায় অতি দ্রুত কঠিন নিরাপত্তা জোরদার না করলে হয়তো সন্ত্রাসীদের কবলে চলে যাবে ইউনিয়নটি, এতে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আহতরা সবাই দিনমজুর। মাগরিবের আজানের পর অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়(ধারণা করা হয় সুপরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী বাহিনী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে) তখন তারাসহ এলাকার সবাই স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় ৩০/৪০ জনের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ লাঠিসোটা, ধারালো রাম দা ও ছুরিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে দিয়ে অতর্কিত ভাবে গালিগালাজ করে দোকানের দিকে এগিয়ে আসে এবং ৮-১০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। দোকানটিতে প্রবেশ করে সবার মোবাইল ফোন চেক করতে চায় এবং হারুনের ছেলে কোথায় জিজ্ঞেস করে। পরক্ষণেই এলোপাতাড়িভাবে কোপাতে শুরু করে অবস্থানরত দোকানের সবাইকে।

তিনি আরো বলেন, গুলিবিদ্ধ মোজাহেদের বড় ভাই দিদারের সাথে এসব সন্ত্রাসীদের পূর্বশত্রুতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে খুঁজতে এসেই সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাছাড়া নিহতের বড় ভাই দিদারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে জানা যায়। এসময় নিহত মোজাহেদ গুলিবিদ্ধসহ ৬ জন গুরুতর আহত হয়।

সন্ত্রাসী গ্রুপ চলে গেলে স্থানীয়রা হতাহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক আবদুল মান্নান বলেন, “আহতদেরকে এক এক করে ৭টার পর থেকে আনা হচ্ছিল। তাদের কারো হাতে, কারো পায়ে এবং কারো মাথায় ধারালো অস্ত্রের গুরুতর আঘাত ছিল। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তবে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে এখানে আনা হয়নি। তাকে সরাসরি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।”

চমেক হাসপাতালের দায়িত্বরত জেলা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আলাউদ্দিন তালুকদার বলেন, রাঙ্গুনিয়া থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মুজাহিদ নামে এক যুবককে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাকে মৃত্যু ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আরও ৬ জন হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে।

এই ব্যাপারে রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুব মিলকী বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে সন্ত্রাসীরা একজনকে পায়ে গুলি করছে এবং যাওয়ার সময় রাস্তার মধ্যে আরও ৫-৬ জনকে কুপিয়ে আহত করেছে।

এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঘটনাস্থলে আছি। একজন গ্রেপ্তার আছে।

এদিকে, এই ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। পাহাড়ে অবস্থান নেয়া চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রুপ এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে এলাকা ছেড়ে অন্তত দেড় শতাধিক পরিবার অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। চিহ্নিত এই সন্ত্রাসীদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, মারামারিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

উল্লেখ্য, সরফভাটা ইউনিয়নে এটাই প্রথম সন্ত্রাসী হামলা নয় এর আগেও গত তিন-চার বছর ধরে এভাবে খুন হচ্ছে, হামলা ও কিডন্যাপের ঘটনা হচ্ছে অহরহ।

সরফভাটা সচেতন মহলের ধারণা, কোন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায় সন্ত্রাসী গ্রুপ। প্রতিটি এলাকায় কিশোর গ্যাং হতে তৈরী হচ্ছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী গ্রুপ। প্রথমে শুরুতে কিশোরদেরকে মাদক দিয়ে উদ্বুদ্ধ করানো হয় পরে সঙ্গবদ্ধ হয়ে হয়ে কিশোর গ্যাং এ পরিণত হয়। এসব গ্যাং পরিচালনার দায়িত্ব চলে যায় এলাকার বড় ভাইদের হাতে। আর এভাবে সংঘটিত হয়ে শক্তিশালী হচ্ছে অপরাধ রাজ্য। এলাকায় কোন সন্ত্রাসী ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের যেন ঘুম ভাঙ্গে এর আগে ও পরে কোন দায়বদ্ধতা নাই।

মন্তব্য

সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর

Developed By: Dotsilicon