![]()
বাকৃবি প্রতিনিধি:
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একই শ্রেণিকক্ষে শুরু হয়েছিল পরিচয়।সহপাঠী থেকে বন্ধুত্ব, প্রেম, অতঃপর পরিণয়। এবার একসঙ্গে বিসিএসের স্বপ্নজয় করলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দম্পতি সাহাজ উদ্দিন বাদল ও জেরিন আক্তার স্বর্ণা।
সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে তারা দুজনই কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (সহকারী পরিচালক) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
বাদল ও স্বর্ণা বাকৃবির কৃষি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী। আশ্চর্যের বিষয় হলো তারা একই অনুষদের, একই বর্ষের এবং জীবনসঙ্গী, এবার একই ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। তাদের এই যুগল সাফল্য এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। সহপাঠী, শিক্ষক, পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অভিনন্দনে সিক্ত হচ্ছেন তারা।
তবে এই তাদের এই অর্জনের শুধু সাফল্যে ভরপুর ছিল না। বাস্তবতার নিরীক্ষে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার গল্প। একাডেমিক চাপের মাঝে সামলিয়েছেন নিজেদের, গুছিয়েছেন ভবিষ্যৎ পুঁজি। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। একে অপরের অনুপ্রেরণা হয়ে এগিয়ে যাওয়ার ফলেই এসেছে এই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
পথচলার শুরু সম্পর্কে সাহাজ উদ্দীন বাদল বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আমাদের পথচলার শুরু ২০১৭ সালে বন্ধুত্বের বন্ধনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি দিনগুলো একসঙ্গে আড্ডা, ঘুরে বেড়ানো আর অসংখ্য স্মৃতি ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে কেটেছে। একসময় উপলব্ধি করলাম, আমরা একে অপরের সত্যিকারের পরিপূরক। তখন আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এই যাত্রায় দুই পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং বন্ধুদের আন্তরিক সহযোগিতা আমাদের সিদ্ধান্তকে আরও সহজ ও দৃঢ় করেছে। আমরা খুব বেশি ক্যারিয়ার কেন্দ্রিক ছিলাম না, তবে নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলাম।’
বিসিএস প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাদল বলেন, ‘৪৪তম বিসিএসে আবেদন করার মাধ্যমে যাত্রা শুরু। তবে পরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি শুরু করি ৪৫ বিসিএস থেকে। প্রথমবারের চেষ্টায় প্রিলিমিনারিতেই ব্যর্থ হয়েছিলাম। কিন্তু সেই ব্যর্থতা আমাদের থামাতে পারেনি। নতুন উদ্যমে আবার শুরু করি। ৪৬ বিসিএসে আমি প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও স্বর্ণা পারেনি। সেই অভিজ্ঞতাই আমাদের আরও কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা বুঝতে পারি, সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই অধ্যবসায়ই একমাত্র পথ।’
বিসিএস প্রস্তুতির পাশাপাশি অন্যন্য প্রস্তুতির বিষয়ে বাদল বলেন, ‘বিসিএসের পাশাপাশি অন্য চাকরির পরীক্ষাগুলোতে আমরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করি। তবে জীবনের এমন একটি সময় এসেছিল, যখন একটি চাকরি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে কিছুদিন আগে সোনালী ব্যাংকে অফিসার জেনারেল পদে এবং স্বর্ণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। এই অর্জন আমাদের দুই পরিবারেই নতুন আশা ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে। আমাদের স্বপ্নপূরণের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।’
জেরিন আক্তার স্বর্ণা তার সাফল্যের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আজকের এই সাফল্য আমার একার প্রচেষ্টার ফল নয়, এর পেছনে আমার পরিবার এবং হাসব্যান্ডের অবদান অপরিসীম। জীবনে পথচলতে অনেকবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছি কিন্তু কখনোই ভেঙে পড়িনি। প্রতিটি কঠিন সময়ে আমার হাসব্যান্ড মনোবল অটুট রাখতে আমার পাশে থেকেছে। সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা ও ইতিবাচক মানসিকতার একজন মানুষ। প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করার অসাধারণ একটি গুণ মহান আল্লাহ তাকে দান করেছেন। তার এই সাহস, প্রেরণা ও অবিচল সমর্থন আমাকে প্রতিনিয়ত সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।’
পড়াশোনার ও সহযোগিতার বিষয়ে তারা বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি সময় কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। সুযোগ পেলেই সেখানে একসঙ্গে পড়াশোনা ও একে অপরকে সহযোগিতা করেছি।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তারা বলেন, ‘বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং পারস্পরিক অনুপ্রেরণা। পরিবার ও একে অপরের অটুট বিশ্বাস অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতে দেয়নি। মহান আল্লাহর অসীম রহমতে আজ আমরা দুজনই বিসিএস ক্যাডার। এই অর্জনের সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই। সবার কাছে দোয়া কামনা করি, কর্মজীবনেও আমরা একইভাবে একে অপরের সহযোগী হয়ে সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশের সেবা করতে পারি।’



মন্তব্য