![]()
এনামুল কবির মুন্না,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
স্বাধীনতার ৫৬ বছর পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের তেগাংগা গ্রামে। কাগজে-কলমে এটি উপজেলা সদরের অংশ হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ পর্যন্ত গ্রামটিতে যাতায়াতের জন্য কোনো সড়ক নির্মিত হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন প্রায় ১০০টি পরিবারের সহস্রাধিক বাসিন্দা। এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা থেকে মুক্তি ও একটি সংযোগ সড়কের দাবিতে সম্প্রতি এলাকাবাসী এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
*বর্ষায় নৌকা, শুকনা মৌসুমে কাদা*
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গ্রামটিতে যাতায়াতের কোনো সুব্যবস্থা নেই। বর্ষাকালে চারদিকে পানি থৈ থৈ করায় তেগাংগা গ্রামটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। তখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। আর শুকনো মৌসুমে ফসলি জমির আইল ও হাঁটু সমান কাদার মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে চলাচল করতে হয় গ্রামবাসীকে।
যোগাযোগের এই ভয়াবহ অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশী ও গর্ভবতী মায়েরা। এছাড়া, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই গ্রামের তরুণ-তরুণীদের বিয়েশাদির ক্ষেত্রেও সামাজিক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। যাতায়াত সংকটের অজুহাতে অনেকেই এই গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে আত্মীয়তা করতে চান না।
*ব্যাহত শিক্ষা, ভরসা নিজস্ব মাদ্রাসা*
যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের কোমলমতি শিশুরা বাইরের কোনো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারছে না। ফলে শিশুদের শিক্ষার আলো দেখাতে গ্রামবাসী নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘দারুলউলুম তেগাংগা মাদ্রাসা’ নামের একটি নূরানী মাদ্রাসা। বর্তমানে গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক শিশু এই মাদ্রাসাতেই প্রাথমিক ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছে।
*দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে গ্রাম*
সরেজমিনে দেখা গেছে, পানির তীব্র স্রোতে গ্রামের মাঝখানের অংশ ভেঙে গিয়ে বর্তমানে গ্রামটি দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্রামটিকে এই ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আন্দোলনরত গ্রামবাসীদের দাবি, “গ্রামে শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু রাস্তার অভাবে বাকি সব নাগরিক সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। মাত্র দেড় কিলোমিটার একটি সংযোগ সড়ক এবং গ্রামের ভেতরের ভাঙা অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করলেই আমাদের এই অর্ধশতকের বঞ্চনার অবসান ঘটবে।”
*জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য*
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে *দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ* বলেন, “তেগাংগা গ্রামবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত সত্য এবং বেদনাদায়ক। বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে হাওরের বাঁধই তাদের একমাত্র ভরসা। এখানে ব্লক দিয়ে যদি একটি স্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ তৈরি করা যায়, তবেই যাতায়াতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। এছাড়া গ্রামের ভেতরের ভাঙন রোধে কালভার্ট নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।”
*দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহ* গ্রামবাসীর দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “তেগাংগা গ্রামের এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আমি অত্যন্ত আন্তরিক। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হবে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জোর সুপারিশ পাঠানো হবে।”
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পরও একটি গ্রামের মানুষ সড়ক যোগাযোগের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে—তা মেনে নেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে তেগাংগাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর।



মন্তব্য