![]()
মোঃ শাকিল মোল্লা, রাজবাড়ী প্রতিনিধি
গোয়ালন্দে শোষণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর করার উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। বিশেষ করে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার শিশু, যৌনপল্লীতে বসবাসকারী শিশু, যৌনকর্মীদের সন্তান এবং পথে বসবাসকারী শিশুদের জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল ১০টায় গোয়ালন্দ উপজেলা সম্মেলন কক্ষে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে, কর্মজীবী কল্যাণ সংস্থা (কেকেএস)-এর বাস্তবায়নে এবং দ্য ফ্রিডম ফান্ডের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় “Enhancing Protection of Child Sex Trafficking Survivors in Bangladesh” প্রকল্পের আওতায় “শোষণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও নিশ্চিতকরণ” শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস। প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজবাড়ীর স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. কল্যাণ চৌধুরী এবং দ্য ফ্রিডম ফান্ডের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ খালেদা আখতার। এছাড়া দ্য ফ্রিডম ফান্ডের প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সুমনা চৌধুরী, দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিব, জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিশু সুরক্ষা কমিটি, মানবপাচার প্রতিরোধ কমিটি ও শিশু কল্যাণ বোর্ডের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী এবং কেকেএসের সহকারী নির্বাহী পরিচালক ফকীর জাহিদুল ইসলাম রুমনসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। কর্মশালায় জানানো হয়, জন্ম নিবন্ধন একটি শিশুর প্রথম আইনি পরিচয় এবং তার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণের পাশাপাশি শিশুবিবাহ, শিশু পাচার, শিশুশ্রম এবং বাণিজ্যিক যৌন শোষণ প্রতিরোধে জন্ম নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়োজকরা জানান, কেকেএসের বাস্তবায়নে এবং দ্য ফ্রিডম ফান্ডের সহযোগিতায় পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও তাদের মায়েদের জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দৌলতদিয়ার পূর্বপাড়ায় ইতোমধ্যে ১৬৫ জনের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১১৬ জন শিশু (৬২ জন মেয়ে ও ৫৪ জন ছেলে) এবং ৪৯ জন মা রয়েছেন।
এছাড়া ৯৫ জনের জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৩ জন শিশু (১৮ জন মেয়ে ও ১৫ জন ছেলে) এবং ৬২ জন মা। নিবন্ধনের বাইরে থাকা শিশুদেরও জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের ফলে এসব শিশু সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, উপবৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, বাল্যবিবাহ ও শিশু পাচার প্রতিরোধ এবং মায়েদের সরকারি ভাতা পাওয়ার সুযোগ সহজ হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে কর্মশালায় তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে প্রশাসন ও নিবন্ধন কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের বদলির কারণে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত না থাকায় সেবা প্রদানে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া এই শিশু ও তাদের মায়েদের জন্ম নিবন্ধনের ফি মওকুফের দাবি জানানো হয়, যাতে তারা আরও উৎসাহিত হয়ে নিবন্ধনের আওতায় আসতে পারেন। কর্মশালায় প্রধান অতিথি ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, জন্ম নিবন্ধন প্রতিটি শিশুর সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার। কোনো শিশুই যেন পরিচয়বিহীন না থাকে, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে। শোষণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আইনসম্মত উপায়ে দ্রুত জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, প্রান্তিক ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সরকারি সেবার আওতায় আনতে জন্ম নিবন্ধনের কোনো বিকল্প নেই। উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম আরও বেগবান করবে। বিশেষ অতিথিরা বলেন, জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং মানবপাচার ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।



মন্তব্য