
স্টাফ রিপোর্টার
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার নোয়াপাড়া জামদানি পল্লী এলাকার পাশে সরকারি জমি ও খেলার মাঠ দখল করে নিটিং ডাইং এন্ড ফিনিশিং কারখানা স্থাপন করার অভিযোগ উঠেছে। কারখানারটি নির্মাণের পর থেকেই এলাকায় খেলাধুলার জায়গা না থাকায় যুবসমাজ মাদক সেবনসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া আর কারখানার নির্গত কেমিক্যাল মিশ্রিত গরম ও রঙিন পানি খেলা হচ্ছে শীতলক্ষা নদী,আশপাশের জলাশয়, পতিত জমি ও জামদানি পল্লী এলাকায়। এতে করে জনস্বাস্থ্য পড়েছে হুমকির মুখে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে
সরকারি জমি ও খেলার মাঠ উদ্ধারে ব্যর্থ হয় এলাকাবাসী। বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে সরকারি জমি ও খেলার মাঠ উদ্ধার হবে এমন আশায় এলাকাবাসী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ বনো ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) নোয়াপাড়া জামদানি পল্লির পূর্বপাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫টি আলাদা দাগে ১২ বিঘা ৭ শতাংশ জমি রয়েছে। ১৯৯৬ সালে নোয়াপাড়া গ্রামের হাজী আলাউদ্দিন পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে লিজ নেন।পরে রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর থেকে লিখিত অনুমতি পেলে শতাধিক পরিবারের যুবকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি সমবায় ভিত্তিতে মাছের খামার গড়ে তোলেন। ২০১১ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। এর পর থেকে লিজ নবায়নের জন্য হাজী আলাউদ্দিন দৌড়ঝাঁপ করলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড লিজ দিতে গড়িমসি করে।
উপায়ন্তর না দেখে ২০১২ সালে তিনি আদালতে মামলা করেন। পরে ওই জমিতে খেলার মাঠ ও জামদানি পল্লীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে মর্মে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রস্তাবে হাজী আলাউদ্দিন আদালতের মামলা তুলে নেন।
তৎকালীন সংসদ সদস্যের প্রস্তাব অনুযায়ী জলাশয় ভরাট করে সেখানে খেলার মাঠ গড়ে তোলা হয়। এরপর থেকে এলাকার শিশু-কিশোররা এ মাঠে খেলাধুলা করছিল। পরে ২০২৩ সালে হাজী আলাউদ্দীন মারা গেলে ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড নামে ওই খেলার মাঠে একটি নিটিং ডায়িং প্রিন্টিং ও ফিনিশিং কারখানা গড়ে উঠে। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে ট্রু ফ্রেব্রিক্স লিমিটেড ও ২২৪ নিটিং ডায়িং প্রিন্টিং ও ফিনিশিং নামক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। সে কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত রঙিন গরম পানি শীতলক্ষ্যা নদী, জলাশয়, পতিত জমিতে, বিসিক জামদানি পল্লীসহ আশপাশের এলাকায় ফেলা হচ্ছে। যে কারণে এলাকার মানুষ পড়েছেন মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।
তারাবো পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চৌধুরী এলাকাবাসীর পক্ষে জলাশয় ভরাট ও সরকারি জমিতে কারখানা স্থাপনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু কোনো ফল আসেনি। পরে হাজী আলাউদ্দিনের ছেলে আলী আকবর বাদী হয়ে দুদক বরাবর আবেদন করেন।
নোয়াপাড়া এলাকার আহাম্মদ আলী বলেন, জায়গাটি খালি থাকাকালে এলাকার শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করেছে। বর্তমানে ডাইং কারখানার নির্গত বর্জ্যে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
কাজীপাড়া এলাকার শরীফ আহমেদ লিটন মিয়া বলেন, ওই ডাইং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নানা ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে। কোন প্রকার ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) ছাড়াই কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের নির্গত বর্জ্য সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদী,খোলা জায়গায়, জলাশয়সহ আশপাশের এলাকায় ফেলছে।
রূপসী কাজীপাড়া গ্রামের জিন্নাত আলী কাজী বলেন, সরকারি জমি হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীদের সহযোগীতায় সেটি দখল হয়। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সরকারি স্বার্থে এই জমি ব্যবহার করা উচিত।
এদিকে টু ফ্রেব্রিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামান বলেন, টু ফ্রেবিক্স লিমিটেডের উৎপাদিত পণ্য শতভাগ রপ্তানিমুখী। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কারখানার জমি লিজ নেয়া।এটা খেলার মাঠ না। এখানে কোন অনিয়ম নেই। প্রতিষ্ঠানটি গ্রিন আর্থ তথা পরিবেশবান্ধব শিল্প-প্রতিষ্ঠান। জনস্বাস্থ্য ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। আরে ব্যাপারে সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী সমস্যা সমাধান করে দিয়েছিলেন। এখন শুধু শুধু আমাদের হয়রানি করার জন্য একটি পক্ষ উঠে পড়ে লেগেছে।
তারাবো পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে বিসিক নোয়াপাড়ায় জামদানী পল্লি স্থাপন করে। তখন জামদানি শিল্পীদের মাঝে এখানে ৪শ’ প্লট হস্তান্তর করে। এ সময় জামদানি পল্লির সুবিধার্থে পাশে সবুজায়ন, স্কুল, খেলার মাঠ স্থাপন করা হয়। দুর্ঘটনাজনিত আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি সরবরাহে এখানে জলাশয়ও রাখা হয়। এখন সেই জলাশয়সহ ১২ বিঘা ৭ শতাংশ জমি বেদখল হয়ে গেছে। আমরা চাই জায়গাটি যেন পুনরায় উদ্ধার করে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নরসিংদী অঞ্চলের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হুমায়ুন কবির বলেন, জায়গাটি নিয়ে মামলার জটিলতা রয়েছে। দুদক থেকে একটি নোটিশও দেওয়া হয়েছিল।পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে স্থাপনা নির্মাণেরও কোনো বিধান নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও তারাবো পৌরসভা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন,সরকারি জমি ও খেলার মাঠ দখলের বিষয়ে এক এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আমাদের জানানো হয়েছে। অবৈধ দখলদাররা যত প্রভাবশালীই হোক ছাড় দেওয়া হবে না। এই জমির বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সরকারি জমি বেদখল হয়ে থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



মন্তব্য