![]()
এ জেড সুজন, তিনিধি, লালপুর (নাটোর):
নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গাসাইজির সেবাশ্রম কেন্দ্রটি কমিটি বিরোধে স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। উভয় পক্ষ আদালতে মামলা দায়ের করাসহ হামলা ও পাল্টা হামলা এবং গোলাগোলির মত ঘটনা ঘটেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের সৎসঙ্গ সেবাশ্রম ওরফে গোসাইজির মন্দিরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।নাটোরের লালপুর উপজেলার পদ্মা নদী ঘেঁষা ৩২৮ বছরের পুরোনো এই আশ্রমকে ঘিরে ধর্মীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে স্থানীয় হিন্দু ধর্মালম্বীদের মাঝে। মনোরম, শান্ত, নিভৃত পরিবেশে ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের সমাধি মঠ সহ নানা নান্দনিক স্থাপনা মন কাড়ে দর্শনার্থীদের। ধর্মীয় বিশ্বাস ও নানা কাহিনীতে আশ্রমটি এলাকাখ্যাত। আশ্রমের প্রায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমান কয়েক কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৯/০৩/২০২৫ তারিখে রাত ৯ টার সময় রামকৃষ্ণপুর প্রাইমারি স্কুলের সামনে উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয়ের ওপর হামলা হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ দিন চিকিৎসা শেষে উত্তম বাহিনীর বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেই মামলা প্রধান আসামি উত্তম কুমার দুড়দুড়িয়া হাই স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক পদে ৮ মাস অনুপস্থিতি থাকার কারণে তাকে তিনবার শোকজ করলে তিনি কোন উত্তর দেননি বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার।
আবার গত ২০/০৫/২০২৫ তারিখে আমপারা কেন্দ্র করে আশ্রমে গোলাগুলি হয় এতে উত্তম কুমারকে প্রধান আসামি করে ১৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
গত ২১/১১/২০২৫ তারিখে আশ্রম কমিটির একাংশের সভাপতি সঞ্জয় কুমারের নেতৃত্বে নবান্ন উৎসব পালন করেন।
অন্যদিকে অন্য অংশের সভাপতি পরিচয় দিয়ে আছেন উত্তম কুমারের দায়ের করা মামলা এবং আশ্রম পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা যায়, আশ্রমের নামে প্রায় ৬৫ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে। যার মধ্যে আবাদি জমি প্রায় ৩০ বিঘা এবং চারটি পুকুর (আনুমানিক ২৫ বিঘা) ও ৮বিঘার আম বাগান রয়েছে যা লীজ দেওয়া রয়েছে। বর্তমান কমিটির অভিযোগ, গত ১২ বছরে আশ্রমের প্রায় ২৫ বিঘা পুকুর প্রায় ১ কোটি টাকা এবং প্রায় ৩০ বিঘা আবাদি জমি প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ও আম বাগান ১০ লক্ষ টাকায় লীজ প্রদান করেন আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার ও প্রধান সেবাইত চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধু। সঞ্জয় কর্মকার সভাপতির পদে থাকাকালীন আশ্রমের কোন সংস্কার এবং উন্নয়ন না করে বিভিন্ন সময় আশ্রমের আয়কৃত প্রায় দেড় কোটি টাকার আত্যসাৎ করেন। তারা আশ্রমের আয়কৃত অর্থ আশ্রমের ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা করেননি। এমনকি কোন অডিট করানো হয়নি। এছাড়া, দান বাক্স লুট, গাছ কর্তন ও বিক্রির সমস্ত অর্থই সঞ্জয় ও তার সহযোগীরা মিলে আত্যসাৎ করেছেন। অভিযোগে আরো বলা হয়, কর্তৃত্ব বজায় রাখতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কমিটির মেয়াদপূর্তির নির্ধারিত সময়ের ৭ মাস পূর্বেই আরেকটি কমিটি গঠন করেন সঞ্জয় কর্মকার ও তার সহযোগীরা। বর্তমান আশ্রম পরিচালনা কমিটি হিসাব নিকাশ চাইলে তা নানা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন সঞ্জয় কর্মকার। অজ্ঞাত কারণে সাবেক সভাপতি সঞ্জয়কে একতরফা সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। সর্বশেষ ১৬ নভেম্বর আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার ও প্রধান সেবাইত শ্রী চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধুর বিরুদ্ধে আদালতে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্যসাতের মামলা দায়ের করেন বর্তমান কমিটির সভাপতি উত্তম কুমার মন্ডল। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জকে মামলার তদন্তভার দিয়েছেন। আগামী ১৯ জানুয়ারি আদালত লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা, যায়, ১৯৮৮ সালের মামলার (মা: নং: ১১৯/৮৮) আদেশে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত বিবাদীগণ যার মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ অন্যান্য ব্যক্তিগণ পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে গঠিত পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি, সহসভাপতি, কোষাধ্যক্ষের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। এবং এই কমিটি ২০০৭ সাল পর্যন্ত আশ্রম পরিচালনা করে। বর্তমান কমিটির সভাপতি উত্তম কুমার মন্ডল ১৯৮৮ ও ২০১২ সালের দুটি মামলার একতরফা রায়ের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে জবাব দাখিল করেছেন। এছাড়া ১৯/২৫ অঃপ্রঃ মামলার অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বর্তমান কমিটির আপীল (মাঃ নং ২৭/২০২৫) গ্রহণ করেছেন মাননীয় আদালত।
আশ্রমের কমিটি নিয়ে ২ পক্ষের মধ্যে আদালতে মামলা চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংশ্লিষ্টরা।
আশ্রমের পরিচালনা কমিটির একাংশের সভাপতি উত্তম কুমার মন্ডল জানান, সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার ও প্রধান সেবাইত শ্রী চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধু যোগসাজেশ করে আশ্রমের প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্যসাৎ করেছেন। তারা আশ্রমের সংস্কার ও উন্নয়ন করেননি। এমনকি কোন অডিট করানো হয়নি। লুটপাটকৃত সমুদয় অর্থ পুনরুদ্ধার করতে সঞ্জয় ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আদালতে দেড় কোটি টাকা আত্যসাতের মামলা দায়ের করেছি। আমি আশ্রমের অর্থ আত্যসাতকারীদে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। তিনি আরো জানান, আদৌতে প্রধান সেবাইত একজন অযোগ্য, ভন্ড, প্রতারক শ্রেণীর লোক। তার সেবাইতের সনদপত্র ও শিক্ষাগত কোন সনদপত্র নেই। তথাপি তিনি বহাল তবিয়তে নানা অনিয়ম করে চলেছেন। তদন্ত করে দেখলেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, পূর্বের স্থানীয় প্রশাসন একতরফাভাবে বিতর্কিত সাবেক কমিটিকে নানা সুবিধা দিয়ে এসেছে। আমি সহ আমার কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে সঞ্জয় কর্মকার ষড়যন্ত্রমূলক একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করে আসছে। নতুন কমিটি হলেও সঞ্জয় কর্মকার আশ্রমের প্রধান সেবাইতের সহযোগীতায় নানা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছেন। এখনও এর কোন সুরাহা হয় নাই। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।
ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের সৎসঙ্গ সেবাশ্রমের প্রধান সেবাইত শ্রী চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধু জানান, অনিয়মের বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা সাবেক কমিটি দিয়ে আশ্রম ভালভাবেই পরিচালনা করছি। লীজ প্রদানকৃত অর্থ দ্বারা আশ্রমের ২০০৭ সালের আগের কমিটির করে যাওয়া ঋণ-কর্জ পরিশোধের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ধার-দেনা পরিশোধের পর ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা দেওয়ার মত অর্থ থাকে না। যার কারণে আশ্রমের ব্যাংক হিসাব নম্বরে টাকা জমা দেওয়া হয়নি। তবে, আশ্রমের সার্বিক আয়-ব্যয়, লীজ প্রদানকৃত অর্থের সমদুয় টাকার হিসাব চাইলে তিনি জবাব না দিয়ে পলায়ন করেন।
আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার জানান, টাকা আত্যসাতের বিষয়টি ভিত্তিহীন, বানোয়াট। এ বিষয়ে মামলা চলমান আছে। এছাড়া আশ্রমের অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুুলহাস হোসেন সৌরভ জানান, আশ্রম কেন্দ্রীক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে দুই পক্ষকেই অনুরোধ করা হয়েছে। সাবেক কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে দেড়কোটি টাকা আতœসাতের মামলার বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে কমিটি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে দ্রত দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে।
লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম জানান, দেড় কোটি টাকা আত্যসাতের মামলার বিষয়টি আমি অবগত। এ বিষয়ে তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এছাড়া সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



মন্তব্য