![]()
আল জোবায়ের, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) অভ্যন্তরীণ শান্তিনিকেতন এলাকার টং দোকানিরা দীর্ঘদিন ধরে অপরিশোধিত এবং দূষিত পানি খাইয়ে আসছে। প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে এমন কর্মকাণ্ড। বিশুদ্ধ পানি সরবারাহের কথা থাকলেও, তা মানছে না টং দোকানিরা।
বুধবার (৩০ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শান্তিনিকেতন এলাকার টং দোকানিরা যে পানির ট্যাপ থেকে পানি সরবারাহ করছেন, সেই পানি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে গোসলের জন্য সরবারাহ করে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই পানি কোনো ধরনের পরিশোধন বা বিশুদ্ধকরণ ছাড়াই শিক্ষার্থীদের খাওয়াচ্ছেন টং দোকানিরা। এছাড়াও এই পানিতেই চলে ধোয়ামোছা, বানানো হয় চা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের দোকানগুলোতে বিশুদ্ধ পানির লাইন দেওয়া হয়নি। দোকানগুলোর ধোয়ামোছা ও পরিস্কারের কাজে একটি ট্যাপ বসানো হয়েছে শান্তিনিকেতন এলাকায়। এই পানি পানের উপযোগী নয়। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন, মেডিকেল সেন্টার এবং প্রশাসনিক ভবনে বিশুদ্ধ পানির লাইন দেওয়া আছে। শান্তিনিকেতনে যে ট্যাপটি দেওয়া আছে সেটি হলের গোসলের পানির লাইনের সাথে যুক্ত রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টং দোকানি জামাল মিয়া বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া পানির লাইন থেকেই পানি আনি আমরা। কিন্তু এই পানি কোথা থেকে আসে তা আমি জানি না। এখনই জানলাম এটা গোসলের পানির লাইনের সাথে যুক্ত। এখন থেকে আমি বিশুদ্ধ পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করবো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি একটু সহযোগিতা করে তাহলে আমাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি খাওয়ানো সহজ হবে।’
আরেক টং দোকানি আমির হোসের অভিযোগ অস্বীকার করলেও, পরে তার কর্মচারির কথায় ট্যাপের পানি খাওয়ানোর সত্যতা পাওয়া যায়। তখন তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে এই পানি খাওয়াই আমি। কিন্তু জানিনা এই পানি গোসলের। এখন থেকে আর খাওয়াবো না।’
এই বিষয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় গোসলের পানি খাওয়াচ্ছে টং দোকানিরা। প্রশাসন কোনো প্রকার স্টেপ নেয়নি। এই পানি খাওয়ার পরেই শিক্ষার্থীরা ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কবে আমরা এমন স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে বাঁচব?
বিশ্ববিদ্যালয়ের মারুফ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসার পর থেকেই দেখছি টং দোকানিরা এই ট্যাপের পানি বোতলে ভরে আমাদের খাওয়াচ্ছে। পানির সোর্স সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশুদ্ধ পানি খাওয়াচ্ছে। আজকে জানতে পারলাম এটা গোসলের পানি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, টং দোকান গুলোতে যেন বিশুদ্ধ পানির সরবারহ করে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের চীফ ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী মো. জামাল হোসেন জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে আবাসিক হলগুলো ছাড়া কোথাও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ লাইন ছিল না। নতুন উপাচার্যের দিকনির্দেশনায় প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবন, লাইব্রেরি ভবন এবং মেডিকেল সেন্টারে বিশুদ্ধ পানির লাইন বসানো হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথাও বিশুদ্ধ পানির লাইন নেই। শান্তিনিকেতনর টং দোকানে যে ট্যাপের পানি খাওয়ার জন্য ব্যবহার করে তা বিশুদ্ধ পানি না। এই পানি হলের গোসলের জন্য শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করে। ডিপ টিউবওয়েল থেকে উত্তলনের পরে শুধু আয়রন পরিষ্কার করে গোসলের জন্য ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়। কিন্তু এই পানি পুরোপুরি বিশুদ্ধ না এবং খাবার অনুপযোগী।’
অপরিশোধিত পানি পানে স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি চীফ মেডিকেল অফিসার (চলতি দায়িত্ব) ডা. ইসমত আরা পারভীন বলেন, ‘এই পানি খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড সহ নানা রোগ হতে পারে। মেডিকেল সেন্টারে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্বর, ঠান্ডার পর আমরা পানিবাহিত রোগের রোগী বেশি পাই। এই ট্যাপের পানি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরেও দোকানিরা এই পানি শিক্ষার্থীদের খাওয়াচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। আশা করি, প্রশাসন এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ. এফ. এম আরিফুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত টং দোকানগুলোতে মনিটরিং পরিচালনা করছি। এই বিষয়গুলো নিয়ে এদের এর আগে জরিমানাও করা হয়েছে। এরপরেও তারা এমন অস্বাস্থ্যকর কাজ করেই যাচ্ছে। তারা যদি আমাদের কথা না শোনে, আমরা এখন থেকে দোকান সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করবো। আমরা কখনো চাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পরুক। আমরা আজকেই এই বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’



মন্তব্য