শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬
 

চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রার পারদ নেমেছে ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রিতে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪

---

এ এইচ কামরুল, চুয়াডাঙ্গাঃ

পৌষ ও মাঘ মাসকে শীতের ভরা মৌসুম বলা হলেও তার আগেই চুয়াডাঙ্গায় জেঁকে বসেছে শীত। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। এ জেলার উপর দিয়ে কর্কট ক্রান্তি রেখা বয়ে যাওয়ায় শীতের সময় তীব্র শীত এবং গরমের সময় প্রচন্ড তাপ বয়ে যায়। শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) সকাল ৯টার দিকে চুয়াডাঙ্গার সর্বোনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হাড় কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশার সাথে হিমশীতল বাতাসে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগ। বেলা বাড়ার সাথে সূর্য উকি দিলেও তা উত্তাপ ছড়াচ্ছে না। এতে খেটে খাওয়া দিনমজুর শ্রমিকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। এ জেলায় শীতের তীব্রতা যত বাড়ছে শীতজনিত রোগও বৃদ্ধি তত পচ্ছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা।
এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় শীতের প্রকোপ বাড়ায় জমে উঠেছে শীতের পোশাক বেচা-কেনাও। শীতের পোশাকের চাহিদা এখন তুঙ্গে। নিউ মার্কেট, শপিংমল থেকে ফুটপাতের দোকান, সব জায়গাতেই ক্রেতাদের ভিড়।
চুয়াডাঙ্গার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক রকিবুল হাসান বলেন, শনিবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল শতকরা ৮৮ শতাংশ। তিনি আরও জানান, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গায় বাড়ছে শীতজনিত রোগ:
শীতের তীব্রতা যত বাড়ছে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসাপাতালে শীতজনিত রোগ বৃদ্ধি পচ্ছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। শীতজনিত ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর থেকে প্রতিকার পেতে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অথবা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার জন্য জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু কনসালট্যান্ট ডা. মাহবুবর রহমান মিলন বলেন, ইদানিং রোটা ভাইরাস ও শীত জনিত কারণে শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ডায়রিয়া রোগী বেশি। বিশেষ করে শিশুরা রোটা ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর কোনো মেডিসিন না থাকার কারনে ৪ থেকে ৫ দিন শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত থাকছে। ৫ দিন পর ভাইরাস মারা গেলে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এর থেকে প্রতিকার পেতে শিশুদের বাসি খাবার খাওয়ানো যাবেনা। যতটা সম্ভব বাইরের খাবার এড়িয়ে চলা ভাল। শিশুদের প্রতি বেশি যত্ন নিতে হবে। মোটা কাপড় পরিধান করাতে হবে। রাস্তার ধারের অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রতি মানুষের সচেতনতা না বাড়লে ডায়রিয়া মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যাবে। ১ দিন থেকে ৬ মাসের শিশুদের বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানো যাবে না। খিচুড়ি খাওয়ানোর ক্ষেত্রেও সতর্ক হতে হবে। বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। যতটুকু সম্ভব বাচ্চাদেরকে সতর্ক রাখতে হবে।
বিপাকে কৃষক-শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ:
শীতের তীব্রতা বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া দিনমজুর ও শ্রমিকরা। শীতের তীব্রতা বাড়লেও এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাদের কাজ করতে হচ্ছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের যে উর্ধ্বগতি, তাতে একদিন কাজ না করলে সংসার চলবেনা। তাই ভোর থেকেই এক প্রকার বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে কাজে যেতে হচ্ছে। এতে অনেকেই শীতজনিত রোগে আক্রান্তও হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার সাতগাড়ি গ্রামের আব্দুল্লাহ নামের নামের এক রাজমিস্ত্রী বলেন, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কাজে এসেছি। কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের কারণে কাপুনি ধরে যাচ্ছে। তবুও কিছুই করার নেই। পেটের দায়ে কাজে আসতেই হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের যে দাম তাতে একদিন কাজে না আসলে খাবার জুটবে না। তাই বাধ্য হয়েই কাজে আসতে হচ্ছে।
আলমডাঙ্গা উপজেলার জেহালা ইউনিয়নের পুটিমারি গ্রামের কৃষক রেজাউল জানান, মাঠে কাজে যাওয়ার কারণে ভোরে উঠতে হয়। মন চায় না এত ঠান্ডায় কাজে যেতে। মাঠে কাজ করার সময় বাতাসের কারণে শরীর কাঁপুনি ধরে হাত-পা যেন বরফ হয়ে আসে। সর্দি-জ্বর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় নাই, ঠান্ডায় ঘরে বসে থাকলে তো খাবার জুটবো না। তাই বাধ্য হয়েই কাজে যেতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ গ্রামের শ্রমিক বনিজ মিয়া জানান, জমিতে ধানের চারা তৈরির জন্য ধান ছেটাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এতো ঠাণ্ডা যে কাদা পানিতে পা রাখা যাচ্ছে না। ঠাণ্ডার কারণে ঠিকমত কাজও করতে পারছেন না। সেইসঙ্গে শীতের পোশাকের অপ্রতুলতা দুর্ভোগ বাড়িয়েছে কয়েক গুণ।
জমে উঠেছে শীতের পোশাক বেচাকেনা:
অপরদিকে চুয়াডাঙ্গায় শীতের প্রকোপ বাড়ায় জমে উঠেছে শীতের পোশাক বেচাকেনা। শীতের পোশাকের চাহিদা এখন তুঙ্গে। নিউ মার্কেট, শপিংমল থেকে ফুটপাতের দোকান, সব জায়গাতেই ক্রেতার ভিড়। বিক্রিও হচ্ছে হরদম। তবে চাহিদা থাকায় শীতের পোশাকের দাম বাড়তি। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় করতে বেশিরভাগ ক্রেতাই ফুটপাতের দোকানেই ঝুঁকছেন। কিনছেন পছন্দের শীতবস্ত্র। বিক্রি বেশি হওয়ায় খুশি দোকানিরাও। এছাড়া শপিংমলে বা খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের শীতের পোশাকের দাম বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতার ভরসা এখন ফুটপাত। সব মিলিয়ে ফুটপাতে থাকা শীতের পোশাক বিক্রির দোকানগুলোতে তুলনামূলক ভিড় বেশি।
চুয়াডাঙ্গা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে- রাস্তার উভয়পাশের ফুটপাতে বাহারি শীতের পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে ওইসব ফুটপাতের দোকানগুলোতে। বিভিন্ন সাইজের সোয়েটার, জ্যাকেট, কানটুপি, মাফলার, শাল, ট্রাউজার, ফুলহাতা গেঞ্জি ও হুডিসহ বিভিন্ন শীতের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে ফুটপাতের এসব দোকান গুলোতে। সাইজ অনুযায়ী দামও আলাদা। এক-দেড়শ টাকা থেকে শুরু করে আটশ’ টাকা দামের পোশাক মিলছে এসব দোকানে। এছাড়া হাত মোজা, কানটুপি ও ছোটখাট শীতের পোশাক মিলছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকার ভেতরেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজার এলাকা, নতুন ব্রীজের পাশে, পোস্ট অফিসের সামনের ফুটপাতে বাচ্চাদের ফুলহাতা গেঞ্জি ও পাজামা বিক্রি করছিলেন আসাদুল নামের এক বিক্রেতা। তিনি বলেন, ‘বড়দের সঙ্গে ছোটদের শীতের কাপড়ের ব্যবসা জমে উঠেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে ক্রেতাদের ভিড় ও বেচাবিক্রি বেড়েছে। আমাদের তো ঈদ উপলক্ষে তেমন বেচাকেনা হয় না। কিন্তু শীতের মৌসুমই হলো আমাদের জন্য চাঁদ রাত।’ প্রচণ্ড শীতের দাপটে শীতের পোশাক কিনতে ফুটপাতেই ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আর এই সুযোগে বিক্রেতারা বেশি দাম হাঁকছেন।
সদর উপজেলার আলুকদিয়ার মনিরামপুর গ্রামের ক্রেতা আরাফাত হোসেন বলেন, ‘মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের ক্রয়সীমায় মোটামুটি সবরকম পোশাকেই ফুটপাতে পাওয়া যায়। শপিংমলগুলোতে কেনাকাটার চেয়ে ফুটপাতে কেনাকাটা সাশ্রয়ী।’
আরাফাত হোসেন আরও বলেন, ক্রেতাদের ভিড় দেখে বিক্রেতারাও বেশি দাম চাচ্ছেন। তবে দরদাম করে কিনতে হচ্ছে।
জেলার আলমডাঙ্গা থেকে আসা বিক্রেতা আকাশ বলেন, ‘এবার আমাদের বেচাকেনা অনেক ভালো। গত শুক্রবার বেচাবিক্রি তেমন না হলেও শীত বাড়ার সাথে সাথে আমাদের বিক্রি বেড়ে গেছে।

মন্তব্য

সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর

Developed By: Dotsilicon